কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পবিত্রতা | শরিফ গাজী অফিসিয়াল

কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পবিত্রতা


কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পবিত্রতা
আরবী طُهْر (তুহর) শব্দটি (ط ه ر) ধাতু থেকে এসেছে। শব্দটি মাদ্বি (অতীত কাল) এর ছিগা হল طَهَرَ (তহারা) ও طَهُرَ (তহুরা) এবং মুদ্বারি (বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কাল) এর ছিগা হল يَطْهُرُ (ইয়াতহুরু) যার অর্থ পবিত্র হওয়া, পাক হওয়া, পরিস্কার হওয়া, পরিচ্ছন্ন হওয়া। এর Verbal Noun طُهْر (তুহর) যার অর্থ পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা। আরেকটি অর্থ হল মহিলাদের ঋতু মুক্তিকাল। এর Noun أَطْهَر (আতহার) যার অর্থ অধিক পবিত্র, পবিত্রতর, পবিত্রতম, উৎকৃষ্টতম। এর Noun طُهُور (তহুর) এর অর্থ পরিষ্কারক, অধিক পবিত্র, পবিত্রতা। এর Verb form II মাদ্বি (অতীত কাল) এর ছিগা হল طَهَّرَ (তহ্হারা) যার অর্থ পরিস্কার করা, পবিত্র করা, পরিচ্ছন্ন করা, জীবাণুমুক্ত করা, খাতনা করা। আল্লাহর বাণী-


يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ وَلَكِنْ يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা সালাতের উদ্দেশে দন্ডায়মান হও তখন (সালাতের পূর্বে) তোমাদের মুখমন্ডল ধৌত কর এবং হাতগুলিকে কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, আর মাথা মাসাহ কর এবং পা’গুলিকে টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে ফেল। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে (গোসল করে) ভালোভাবে পবিত্র হও। কিন্তু যদি রোগগ্রস্ত হও কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ যদি মলত্যাগ করে আসে কিংবা তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ কর (স্ত্রী-সহবাস কর), অতঃপর পানি না পাও তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও, তখন তোমরা তা দ্বারা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত মাসাহ কর, আল্লাহ তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা আনয়ন করতে চান না, বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে ও তোমাদের উপর স্বীয় নি‘আমাত পূর্ণ করতে চান, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আল-মায়িদাহ, ৫/৬

উপরের আয়াতের প্রথম অংশে সালাতের জন্য আল্লাহ এক ধরণের পবিত্রতার কথা বলেছেন যাকে আমরা অজু বলে থাকি। অজুর ফরযগুলি পর আল্লাহ বলছেন- আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে (গোসল করে) ভালোভাবে পবিত্র হও। আল-মায়িদাহ, ৫/৬

এ থেকে বুঝা যায়, পবিত্রতা দুই প্রকার ১। ছোট পবিত্রতা অর্থাৎ অজু এবং ২। বড় পবিত্রতা অর্থাৎ গোসল। সালাতের জন্য বড় পবিত্রতার প্রয়োজন হলে অবশ্যই গোসল করতে হবে আর যদি বড় পবিত্রতার প্রয়োজন না হয় তাহলে অজু করে সালাত আদায় করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোসলঃ 
মায়মূনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা  থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
وَضَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَضُوءًا لِجَنَابَةٍ فَأَكْفَأَ بِيَمِينِهِ عَلَى شِمَالِهِ مَرَّتَيْنِ، أَوْ ثَلاَثًا، ثُمَّ غَسَلَ فَرْجَهُ، ثُمَّ ضَرَبَ يَدَهُ بِالأَرْضِ ـ أَوِ الْحَائِطِ ـ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا، ثُمَّ مَضْمَضَ وَاسْتَنْشَقَ، وَغَسَلَ وَجْهَهُ وَذِرَاعَيْهِ، ثُمَّ أَفَاضَ عَلَى رَأْسِهِ الْمَاءَ، ثُمَّ غَسَلَ جَسَدَهُ، ثُمَّ تَنَحَّى فَغَسَلَ رِجْلَيْهِ‏.‏ قَالَتْ فَأَتَيْتُهُ بِخِرْقَةٍ، فَلَمْ يُرِدْهَا، فَجَعَلَ يَنْفُضُ بِيَدِهِ‏.‏
রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাবাতের গোসলের জন্য পানি রাখলেন, তারপর দু’বার বা তিনবার ডান হাতে বাম হাতের উপর পানি ঢাললেন এবং তাঁর লজ্জাস্থান ধুইলেন। তারপর তাঁর হাত মাটিতে বা দেওয়ালে দু’বার বা তিনবার ঘষলেন। পরে তিনি কুলি করলেন ও নাকে পানি দিলেন এবং চেহারা ও দু’হাত ধুইলেন। তারপর তাঁর মাথায় পানি ঢাললেন এবং তাঁর শরীর ধুইলেন। একটু সরে গিয়ে তাঁর দুই পা ধুইলেন। মায়মূনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা  বলেন, এরপর আমি একখন্ড কাপড় দিলে তিনি তা নিলেন না, বরং নিজ হাতে পানি ঝেড়ে ফেলতে থাকলেন। সহীহুল বুখারী : ২৭৪

সালাতের জন্যই অযু শর্তঃ
ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,
 أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ مِنَ الْخَلاَءِ فَأُتِيَ بِطَعَامٍ فَذَكَرُوا لَهُ الْوُضُوءَ فَقَالَ ‏ "‏ أُرِيدُ أَنْ أُصَلِّيَ فَأَتَوَضَّأَ ‏"
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৌচাগার থেকে বের হলেন। ইতিমধ্যে খানা হাজির করা হল। লোকজন তাকে উযুর কথা স্মরন করিয়ে দিল। তখন তিনি বললেন, আমি কি স্বলাত আদায়ের ইচ্ছা করছি যে উযু করব? সহিহ মুসলিম : ৭১৩

ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَجَاءَ مِنَ الْغَائِطِ وَأُتِيَ بِطَعَامٍ فَقِيلَ لَهُ أَلاَ تَوَضَّأُ فَقَالَ ‏ "‏ لِمَ أَأُصَلِّي فَأَتَوَضَّأَ "
আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম। তিনি পায়খানা থেকে এলেন। খানা হাযির করা হল। তাকে বলা হলো আপনি কি উযু করবেন না? তখন তিনি বললেন, কেন আমি কি স্বলাত আদায় করব, যে উযু করব? সহিহ মুসলিম : ৭১৪

বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা জন্যও অযু শর্তঃ
আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা  থেকে বর্ণিত,
 أَنَّ أَوَّلَ، شَىْءٍ بَدَأَ بِهِ حِينَ قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ تَوَضَّأَ، ثُمَّ طَافَ، ثُمَّ لَمْ تَكُنْ عُمْرَةً، ثُمَّ حَجَّ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ ـ رضى الله عنهما ـ مِثْلَهُ،
রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম উযূ করে তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই তাওয়াফটি ‘উমরার তাওয়াফ ছিল না। তারপর আবূ বকর ও ‘উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা অনুরুপভাবে হজ্জ করেছেন। সহীহুল বুখারী : ১৬১৪, ১৬১৫

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে উযূ করতেন?
ইয়াহিয়া আল-মাযিনী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ‘আবদুল্লাহ ইবনু যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে  জিজ্ঞাসা করলঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে উযূ করতেন? আবদুল্লাহ ইবনু যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ
فَدَعَا بِمَاءٍ، فَأَفْرَغَ عَلَى يَدَيْهِ فَغَسَلَ يَدَهُ مَرَّتَيْنِ، ثُمَّ مَضْمَضَ وَاسْتَنْثَرَ ثَلاَثًا، ثُمَّ غَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثًا، ثُمَّ غَسَلَ يَدَيْهِ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ، ثُمَّ مَسَحَ رَأْسَهُ بِيَدَيْهِ، فَأَقْبَلَ بِهِمَا وَأَدْبَرَ، بَدَأَ بِمُقَدَّمِ رَأْسِهِ، حَتَّى ذَهَبَ بِهِمَا إِلَى قَفَاهُ، ثُمَّ رَدَّهُمَا إِلَى الْمَكَانِ الَّذِي بَدَأَ مِنْهُ، ثُمَّ غَسَلَ رِجْلَيْهِ‏.‏
তিনি পানি আনালেন। হাতের উপর সে পানি ঢেলে দু’বার তাঁর হাত ধুইলেন। তারপর কুলি করলেন এবং তিনবার নাকে পানি দিয়ে ঝেড়ে পরিস্কার করলেন। এরপর চেহারা তিনবার ধুইলেন। তারপর দু’হাত কনুই পর্যন্ত দু’বার করে ধুইলেন। তারপর দু’হাত দিয়ে মাথা মসেহ করলেন। অর্থাৎ হাত দু’টি সামনে ও পিছনে নিলেন। মাথার সম্মুখ ভাগ থেকে শুরু করে উভয় হাত পিছন পর্যন্ত নিলেন তারপর আবার যেখান থেকে নিয়েছিলেন সেখানেই ফিরিয়ে আনলেন। তারপর দু’পা ধুইলেন। সহীহুল বুখারী : ১৮৫

উসমান ইবনু আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর আযাদকৃত গোলাম হুমরান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিতঃ
أَنَّهُ رَأَى عُثْمَانَ دَعَا بِوَضُوءٍ، فَأَفْرَغَ عَلَى يَدَيْهِ مِنْ إِنَائِهِ، فَغَسَلَهُمَا ثَلاَثَ مَرَّاتٍ، ثُمَّ أَدْخَلَ يَمِينَهُ فِي الْوَضُوءِ، ثُمَّ تَمَضْمَضَ، وَاسْتَنْشَقَ، وَاسْتَنْثَرَ، ثُمَّ غَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثًا وَيَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ ثَلاَثًا، ثُمَّ مَسَحَ بِرَأْسِهِ، ثُمَّ غَسَلَ كُلَّ رِجْلٍ ثَلاَثًا، ثُمَّ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا وَقَالَ ‏ "‏ مَنْ تَوَضَّأَ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ، لاَ يُحَدِّثُ فِيهِمَا نَفْسَهُ، غَفَرَ اللَّهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ 
তিনি উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে উযূর পানি আনাতে দেখলেন তারপর তিনি সে পাত্র থেকে উভয় হাতের উপর পানি ঢেলে তা তিনবার ধুয়ে ফেললেন। এরপর তাঁর ডান হাত পানিতে ঢুকালেন। এরপর কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিয়ে নাক ঝেরে ফেললেন। এরপর তাঁর মুখমণ্ডল তিনবার এবং উভয় হাত কুনই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন, এরপর মাথা মাসাহ করলেন। এরপর প্রত্যেক পা তিনবার ধোয়ার পর বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমার এ উযূর ন্যায় উয়ূ করতে দেখেছি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি আমার এ উযূর ন্যায় উযূ করে দু’রাক‘আত স্বলাত আদায় করবে এবং তার মধ্য কোন বাজে খেয়াল মনে আনবে না, মহান আল্লাহ তাঁর অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দিবেন।’ সহীহুল বুখারী : ১৬৪, ১৫৯

মুমিন অপবিত্র হয় নাঃ
উপরের কুরআনের আয়াতে একটি বিষয় লক্ষনীয় যে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ
“হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা সালাতের উদ্দেশে দন্ডায়মান হও তখন (সালাতের পূর্বে) তোমাদের মুখমন্ডল ধৌত কর এবং হাতগুলিকে কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, আর মাথা মাসাহ কর এবং পা’গুলিকে টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে ফেলো”। এই অংশে আল্লাহ পবিত্র কিংবা অপবিত্র শব্দ ব্যবহার করেননি। কিন্তু পরের অংশে আল্লাহ বললেন, وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا “আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে (গোসল করে) ভালোভাবে পবিত্র হও”; আল-মায়িদাহ, ৫/৬। অর্থাৎ এই অংশে অপবিত্র ও পবিত্র শব্দ ব্যবহার করেছেন। এ থেকে বুঝা যায় মুমিন গোসল ফরয না হলে অপবিত্র হয় না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
سُبْحَانَ اللَّهِ إِنَّ الْمُؤْمِنَ لاَ يَنْجُسُ
 সুবহানাল্লাহ! মুমিন অপবিত্র হয় না। সহিহ মুসলিম : ৭১০

হায়েযকালে নারীগণ অপবিত্রঃ
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ وَلا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
আর তারা তোমাকে (নারীদের) হায়েয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে; তুমি বল, তা অশুচি; তাই তোমরা হায়েযকালে স্ত্রী-সহবাস হতে বিরত থাক এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা পবিত্র হয় তাদের নিকটে স্ত্রী-সহবাসে যেও না; অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়, তখন তাদের নিকট গমন কর (যৌনকর্ম কর) যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কারীদেরকে আর পবিত্রতা অবলম্বন কারীদেরকে ভালবাসেন। আল-বাকারাহ, ২/২২২

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
فَإِذَا أَقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلاَةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْتَسِلِي وَصَلِّي 
হায়েয শুরু হলে স্বলাত ছেড়ে দেবে আর হায়েয শেষ হলে গোসল করে স্বলাত আদায় করবে। সহীহুল বুখারী : ৩২০

তায়াম্মুম সম্পর্কে আরও একটি আয়াতঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَقْرَبُوا الصَّلاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ وَلا جُنُبًا إِلا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّى تَغْتَسِلُوا وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا
হে মুমিনগণ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাতের কাছেও যেও না, যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার এবং অপবিত্র অবস্থায়ও (সালাতের কাছে যেও না), যতক্ষণ না তোমরা গোসল কর, তবে পথ অতিক্রমকারী হলে ভিন্ন কথা আর যদি তোমরা অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ মলত্যাগ করে আসে কিংবা তোমরা স্ত্রী সম্ভোগ কর তখন যদি পানি না পাও তবে পবিত্র মাটিতে তায়াম্মুম কর, অতঃপর তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত মাসাহ কর, নিশ্চয় আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল। আন-নিসা, ৪/৪৩

এই আয়াতে “তবে পথ অতিক্রমকারী হলে ভিন্ন কথা” এর অর্থ হলে সে গোসল না করে শুধু তায়াম্মুম করে নামায পড়তে পারবে। তায়াম্মুম تيمم এর আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা। এখানে অর্থ হবে, ওযু ও গোসলের সময় পানি ব্যবহার অসম্ভব হলে মাটি দ্বারা পবিত্র হওয়ার নির্ধারিত কর্ম সম্পাদন করা। মাটিতে হাত স্পর্শ করে প্রথমে মুখমন্ডল মাসাহ করা অতঃপর উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসাহ করা। শরীয়তের পরিভাষায় একে তায়াম্মুম বলে।
কেউ কেউ বলেছেন, এখানে সালাত অর্থ সালাত আদায়স্থল। তাহলে অর্থ হবে, তোমরা অপবিত্র অবস্থায় সালাত আদায়স্থল তথা মসজিদে যেতে পারবে না। তবে পথ অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে। (যুবদাতুত-তাফসীর)

হাদীসের আলোকে তায়াম্মুমঃ
আম্মার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
فَضَرَبَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِيَدِهِ الأَرْضَ، فَمَسَحَ وَجْهَهُ وَكَفَّيْهِ‏.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাটিতে হাত মারলেন এবং তাঁর চেহারা এবং উভয় হাতের কব্জি মাসাহ করলেন। সহীহুল বুখারী : ৩৪৩

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমার জন্য হাত দিয়ে এরুপ করাই যথেষ্ট ছিল-
وَضَرَبَ بِيَدَيْهِ إِلَى الأَرْضِ فَنَفَضَ يَدَيْهِ فَمَسَحَ وَجْهَهُ وَكَفَّيْهِ
আর তিনি তার উভয় হাত মাটিতে মারলেন অতঃপর ঝেড়ে ফেললেন আর মুখমন্ডল এবং উভয় হাতের কব্জি মাসাহ করলেন। সহিহ মুসলিম : ৭০৫

কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা
কুরআনুল কারিম স্পর্শ করার জন্য অযু করা মুস্তাহাব, তবে অযু ব্যতীতও কুরআন স্পর্শ করা জায়েয। কুরআন ও সহীহ সুন্নাহের এমন কোনো দলিল নেই, যার দ্বারা প্রমাণ হয় যে, অযু ব্যতীত মুসহাফ (কুরআন) স্পর্শ করা যাবে না।

কুরআন পবিত্র গ্রন্থঃ
رَسُولٌ مِنَ اللَّهِ يَتْلُو صُحُفًا مُطَهَّرَةً
আল্লাহর নিকট হতে এক রাসূল এসেছে, যে পাঠ করে পবিত্র গ্রন্থ। আল-বাইয়্যিনাহ, ৯৮/২

কুরআন সংরক্ষিত আছে লওহে মাহফুজে
بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ 
বরং তা সম্মানিত কুরআন। লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ। আল-বুরুজ, ৮৫/২১-২২ 
فِي صُحُفٍ مُكَرَّمَةٍ مَرْفُوعَةٍ مُطَهَّرَةٍ بِأَيْدِي سَفَرَةٍ كِرَامٍ بَرَرَةٍ
এটা লিপিবদ্ধ আছে মর্যাদাসম্পন্ন কিতাবসমূহে (অর্থাৎ লওহে মাহফুজে), সমুন্নত, পবিত্র। এমন লেখকদের হাতে, যারা মহাসম্মানিত, পূত-পবিত্র। আবাসা, ৮০/১৩-১৬

إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ فِي كِتَابٍ مَكْنُونٍ لا يَمَسُّهُ إِلا الْمُطَهَّرُونَ تَنْزِيلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ أَفَبِهَذَا الْحَدِيثِ أَنْتُمْ مُدْهِنُونَ
নিশ্চয় এটি মহা সম্মানিত কুরআন, যা (লিখিত) আছে সুরক্ষিত কিতাবে, পুত-পবিত্রগণ (ফেরেশতা) ছাড়া (শয়তানেরা) তা স্পর্শ করতে পারে না। জগৎসমূহের রবের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। তবুও কি তোমরা এই (হাদীসকে) বাণীকে তুচ্ছ গণ্য কর? আল-ওয়াকিয়া, ৫৬/৭৭-৮১

নিম্নের হাদীস প্রমাণ করে অজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা যায়ঃ
ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। আবু সুফিয়ান তাঁকে মুখোমুখি (প্রত্যক্ষ) এ ঘটনা বর্ণনা করছেন। তিনি বলেনঃ আমার (তথা কুরাইশ) ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর মধ্যে (হুদাইবিয়ার) সন্ধিচুক্তি সূত্রে আবদ্ধকালে (একদল ব্যবসায়ী আরব কাফেলাসহ) আমি সিরিয়ার গেলাম। এ সময় হঠাৎ (রোম সম্রাট) হিরাক্লাস (উপাধি কায়সার)-এর নামে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র গিয়ে পৌঁছালো। পত্রখানা নিয়েছেন (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর দূত) দিহইয়া কালবি (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) তিনি তা দিয়েছেন বুসরার শাসনকর্তার কাছে আর তিনি তা পৌঁছিয়েছেন সম্রাট হিরাক্লাস এর কাছে। .........

قَالَ ثُمَّ دَعَا بِكِتَابِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَرَأَهُ فَإِذَا فِيهِ ‏"‏ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ سَلاَمٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّي أَدْعُوكَ بِدِعَايَةِ الإِسْلاَمِ أَسْلِمْ تَسْلَمْ وَأَسْلِمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ وَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمَ الأَرِيسِيِّينَ وَ ” يَٰٓأَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ تَعَالَوۡاْ إِلَىٰ كَلِمَةٖ سَوَآءِۢ بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمۡ أَلَّا نَعۡبُدَ إِلَّا ٱللَّهَ وَلَا نُشۡرِكَ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗا وَلَا يَتَّخِذَ بَعۡضُنَا بَعۡضًا أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِۚ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَقُولُواْ ٱشۡهَدُواْ بِأَنَّا مُسۡلِمُونَ“  [ال عمران: ٦٤ [
আবু সুফিয়ান বলেনঃ অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি তলব করেন, হিরাকল চিঠি হাতে নিয়ে পড়ল, তাতে ছিল: “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহর পক্ষ থেকে রোমের প্রধান হিরাকলের নিকট। হিদায়াত অনুসরণকারীর উপর সালাম, অতঃপরঃ আমি তোমাকে ইসলামের আহবান জানাচ্ছি, ইসলাম গ্রহণ কর নিরাপদ থাকবে। আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ সাওয়াব প্রদান করবেন। তবে যদি তুমি (এ আহবানে) সাড়া না দেও, তাহলে রোম সাম্রাজ্যের কৃষককুলের (সাধারণ প্রজাদের) পাপের বোঝা তোমাকেই বইতে হবে। (আল্লাহর বাণী) “হে আহলে-কিতাব! তোমরা এমন কথার দিকে আস, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, তা এই যে, আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করব না আর তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করব না এবং আল্লাহ ছাড়া আমাদের কেউ কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ করব না তারপর যদি তারা বিমুখ হয় তবে তুমি বলে দাও, ‘তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম”। আলে‘ইমরান, ৩/৬৪ (সহিহ মুসলিম : ৪৪৯৯)

মন্তব্যঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনুল কারিমের এ আয়াতসহ নাসারাদের নিকট চিঠি প্রেরণ করেছেন। তিনি অবশ্যই জানতেন যে, এ চিঠি তারা স্পর্শ করবে, তবুও তিনি আয়াত লিখেছেন। চিঠিতে বিদ্যমান আয়াতটি কুরআনুল কারিমের হুকুম রাখে না, বরং এটা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহ ওয়াসাল্লামের বক্তৃতার অংশ, অথবা তাফসীরের কিতাবে বিদ্যমান আয়াতের ন্যায় একটি আয়াত, যা অযু ব্যতীত স্পর্শ করা বৈধ।

উপসংহারঃ উপরের কুরআনের আয়াত ও হাদীসের আলোকে বলা যায়, দুটি ইবাদতের জন্যই ওযু শর্ত ১. সালাত ২. বাইতুল্লাহ তাওয়াফ। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে ওযু শর্ত নয় তবে অযু করে নেওয়া মুস্তাহাব। যেমন- কুরআন স্পর্শ করার ক্ষেত্রে। যদি বড় পবিত্রতা আবশ্যক না হয় অর্থাৎ গোসল ফরয না হয় তাতে কুরআন স্পর্শ করা যাবে। যদি গোসল ফরয হয় তবে কুরআন স্পর্শ করা যাবে না, গোসল করে কুরআন স্পর্শ করতে হবে। কিন্তু ওজর থাকলে তায়াম্মুম করে সালাত ও অন্যান্য ইবাদত কিংবা কুরআন স্পর্শ করতে পারবে। নারীগণ হায়েযকালে অপবিত্র তাই নারীরা হায়েযকালে কোন ইবাদত করতে পারবে না এবং কুরআনও স্পর্শ করতে পারবে না তবে স্পর্শ না করে মুখস্থ কুরআন তিলায়াত করতে পারবে কিংবা মুখস্থ দু‘আ-কালাম পড়তে পারবে। সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত আছে, বিনা অযুতে কুরআন পাঠ করা যায়। (বুখারী: ১৮৩)
সহীহুল বুখারীতে আরও বর্ণিত আছে, জানাবত বা অন্য কারণে অপবিত্র অবস্থায় মহান আল্লাহর যিকির করা যায়। আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন-
كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَذْكُرُ اللَّهَ عَلَى كُلِّ أَحْيَانِهِ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময়ই আল্লাহর যিকর করতেন। সহিহ মুসলিম: ৭১২

কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পবিত্রতা
কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পবিত্রতা

Price : *Happy Shopping
Order via whatsapp Order via Email

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আজকের আইডিয়ার নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Content copy is disabled! Default text copied.