রাসূল (স.) সম্পর্কে জাল বা বানাওয়াট হাদীছ
রাসূল (স.) সম্পর্কে জাল বা বানাওয়াট হাদীছ
(১) জাবের (রাঃ) একদা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট আরয
করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ছাঃ)! আমার পিতা-মাতা আপনার
জন্য কুরবান হউক। আপনি বলুন, আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম
কোন বস্তু সৃষ্টি করেছেন? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উত্তরে
বললেন, হে জাবের! আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রথম তাঁর নূর
দ্বারা তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আল্লাহ
তা‘আলা সে নূরকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগ দ্বারা
কলম, এক ভাগ দ্বারা লাওহে মাহফূয ও একভাগ দ্বারা আরশে
আযীম সৃষ্টি করেছেন। এভাবে ক্রমান্বয়ে চন্দ্র, সূর্য,
গ্রহ-নক্ষত্র, আসমান-যমীন ফেরেশতা, জিন প্রভৃতি সৃষ্টি
হয়ে থাকে। (মৌলভী মুহাম্মদ যাকির হুসাইন, মুকাম্মাল
মীলাদে মুস্তফা (সঃ), পৃঃ ৪১। ) এই হাদীছটি বাতিল, কোন
হাদীছ গ্রন্থে হাদীছটি পাওয়া যায় না।
(২) লাওহে মাহফূয সৃষ্টির পর তাতে আল্লাহর নামের
পার্শ্বে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নাম অর্থাৎ কালেমায়
তাইয়িবাহ লিখে রাখা হয়। ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল
(ছাঃ) এরশাদ করেছেন, জান্নাতে আদম (আঃ) যখন আল্লাহর
একটি আদেশ লংঘন করে পরে নিজ ভুল বুঝতে পারলেন, তখন
তিনি আল্লাহ তা‘আলার নিকট এভাবে প্রার্থনা করলেন, হে
আল্লাহ রাববুল আলামীন! আপনি আমাকে মুহাম্মাদের
অসীলায় ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ পাক তাকে জিজ্ঞেস
করলেন, হে আদম! তুমি মুহাম্মাদকে চিনলে কিভাবে, তাঁকে
তো আমি এখন পর্যন্ত সৃষ্টি করিনি? তখন আদম (আঃ) বললেন,
হে দয়াময় প্রভু! আমাকে সৃষ্টি করে যখন আপনি আমার মধ্যে
রূহ ফুঁকে দিলেন, তখন আমি চক্ষু মেলে তাকিয়ে দেখলাম,
আরশের গায়ে লেখা রয়েছে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা-হ’। তখন আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই
আপনি ঐ ব্যক্তির নাম আপনার নিজের সাথে যুক্ত করে
দিয়েছেন, যিনি আপনার নিকট সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি।
আল্লাহ তা‘আলা বললেন, হে আদম! তুমি ঠিকই বলেছ।
নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ সৃষ্টি জগতের মধ্যে আমার নিকট
সর্বাধিক প্রিয়। এমনকি তাঁকে সৃষ্টি না করলে আমি
তোমাকেও সৃষ্টি করতাম না। (মুকাম্মাল মীলাদে মুস্তফা
(সঃ), পৃঃ ৪১। )
ইমাম ত্বহাবী বলেন, হাদীছটি আহলুল ইলমের নিকট
নিতান্ত দুর্বল। ( তাহযীবুত তাহযীব ২/৫০৮ পৃঃ। )
আবূদাঊদ, আবূ যুর‘আ, ইমাম নাসাঈ, ইমাম দারা-কুত্বনী এবং
ইবনে হাজার আস-ক্বালানী সবাই বলেন, হাদীছটি দুর্বল।
(ইমাম নাসাঈ, কিতাবুয যু‘আফা ওয়াল মাতরূকীন, পৃঃ ১৫৮,
হা/৩৭৭। )
ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, হাদীছটি যে দুর্বল এ
ব্যাপারে সবাই একমত। নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন,
হাদীছটি বানাওয়াট।(সিলসিলা যঈফা হা/২৫। ) ইমাম
আলুসী হানাফী বলেন, হাদীছটির কোন ভিত্তিই নেই।
(গায়াতুল আমানী ১/৩৭৩। )
(৩) হাদীছে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় প্রিয়তম
নবী (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘যদি আপনাকে সৃষ্টি
না করতাম, তবে নিশ্চয়ই এ কুল-মাখলূক সৃষ্টি করতাম না’।
(মুকামমাল মীলাদে মুস্তফা (সঃ), পৃঃ ৪০। ) হাদীছটি
বানাওয়াট, বাতিল।
(৪) হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)! আপনি না হ’লে আসমান-যমীন
কিছুই সৃষ্টি করতাম না। ( আবুল হাসান আল-কাত্তানী,
তানযীহুশ শরী‘আত আন আহাদীছিশ শী‘আ, ১/৩২৫। ) ইবনু
জাওযী বলেন, হাদীছটি যে বানাওয়াট এতে কোন সন্দেহ
নেই। ইমাম দারা-কুত্বনী বলেন, হাদীছটি দুর্বল। ফালাস
বলেন, হাদীছটি বানাওয়াট।(ইবনুল জাওযী, কিতাবুল
মাওযূ‘আত, ২/১৯। )
(৫) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, অর্থাৎ আল্লাহ
রাববুল আলামীন সর্বপ্রথম আমার নূরকে সৃষ্টি করেছেন।
(মুকাম্মাল মীলাদে মুস্তফা (সঃ), পৃঃ ৭৭। ) এটা হাদীছ নয়;
বরং ছূফীদের বানাওয়াট কথা।
(৬) হে মুহাম্মাদ (ছাঃ)। আপনি না হ’লে আসমান-যমীন,
আরশ-কুরশী, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদি কিছুই সৃষ্টি করা হ’ত না।
ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, এটি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর
হাদীছ নয়। এটি কোন বিদ্বান তাঁদের হাদীছ গ্রন্থে
হাদীছে রাসূল বলে উল্লেখ করেননি এবং ছাহাবায়ে
কেরাম থেকেও বর্ণিত হয়নি। বরং এটি এমন একটি কথা,
যার বক্তা জানা যায় না। (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১১/৯৬। )
(৭) আদম (আঃ) সৃষ্টি হয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে জ্যোতির্ময়
নক্ষত্র রূপে মুহাম্মাদের নূর অবলোকন করে মুগ্ধ হন।
(৮) মি‘রাজের সময় আল্লাহ পাক তাঁর নবীকে জুতা সহ আরশে
আরোহন করতে বলেন, যাতে আরশের গৌরব বৃদ্ধি
পায়’ (নাঊযুবিল্লাহ)।
(৯) রাসূলের জন্মের খবরে খুশি হয়ে আঙ্গুল উঁচু করার কারণে
ও সংবাদ দানকারিণী দাসী ছুওয়াবাকে মুক্তি দেয়ার
কারণে জাহান্নামে আবু লাহাবের হাতের দু’টি আঙ্গুল পুড়বে
না। এছাড়াও প্রতি সোমবার রাসূল (ছাঃ)-এর জন্ম দিবসে
জাহান্নামে আবু লাহাবের শাস্তি মওকূফ করা হবে বলে
আববাস (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে দেখা একটি
স্বপ্নের বর্ণনা তাঁর নামে সমাজে প্রচলিত আছে, যা
ভিত্তিহীন।
(১০) মা আমেনার প্রসবকালে জান্নাত হ’তে বিবি মরিয়াম,
বিবি আসিয়া ও মা হাজেরা দুনিয়ায় নেমে এসে সবার
অলক্ষ্যে ধাত্রীর কাজ করেন।
(১১) নবীর জন্ম মুহূর্তে কা‘বার প্রতিমাগুলো হুমড়ি খেয়ে
পড়ে, রোমের অগ্নি উপাসকদের ‘শিখা অনির্বাণ’গুলো দপ
করে নিভে যায়। বাতাসের গতি, নদীর প্রবাহ, সুর্যের
আলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ইত্যাদি...। ( মৌলুদে
দিল পছন্দ, মৌলুদে ছাদী, আল-ইনছাফ, মিলাদ মাহফিল
প্রভৃতি দ্রষ্টব্য। ) উপরের বিষয়গুলো সবই বানাওয়াট ও
ভিত্তিহীন।( বিস্তারিদ দ্রঃ মাওযু‘আতে কবীর প্রভৃতি; ডঃ
মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, মীলাদ প্রসঙ্গ, পৃঃ ১২।)
জাল হাদিস তৈরির কারনঃ
১. বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য মুনাফিক দ্বারা
পরিকল্পিতভাবে
২. মুহাম্মদ (স.) এর মর্যাদা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে।
৩. ইহুদী ও খ্রিস্টানদের নবী থেকে মুসলমানদের নবীকে
বড় করে দেখাতে।
৪. অন্ধ ভালবাসার কারণে।
৫. ওয়াজে/মাহফিলে নিজের বক্তব্য সুন্দর করে মানুষকে
আকৃষ্ট করতে।
উল্লেখ্য, আপনি ঈমান শুধু মুহাম্মদ (স.) এর উপর আনলেই
মুসলমান হতে পারবেন না। বিশ্বাস সকল নবীদেরকেই
করতে হবে। আর সকল নবীই সমান।তোমরা বল, আমরা ঈমান
এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের
প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক,
ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা,
অন্যান্য নবীকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা
হয়েছে, তৎসমুদয়ের উপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি
না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী। (Al-Baqara: 136)
বলুন, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা কিছু
অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের উপর, ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক,
ইয়াকুব এবং তাঁদের সন্তানবর্গের উপর আর যা কিছু
পেয়েছেন মূসা ও ঈসা এবং অন্যান্য নবী রসূলগণ তাঁদের
পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আমরা তাঁদের কারো মধ্যে
পার্থক্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত। (Aal-i-Imraan:
84)
Price : *Happy Shopping

আজকের আইডিয়ার নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url