মাযহাব মানা ফরয নাকি রসূল(সাঃ) এর আনুগত্য করা ফরয
মাযহাব মানা ফরয নাকি রসূল(সাঃ) এর আনুগত্য করা ফরয?
" হে মুমিনগণ ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের (সাঃ)
আনুগত্য কর। আর তোমাদের আমলসমুহ বিনষ্ট করো না।"[সুরা-
মুহাম্মদ, আয়াত-৩৩]" রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহন কর এবং যা
নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক ।"[সুরা-হাশর, আয়াত-৭]"আর যে
কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহকে ভয় করে এবং
তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করে, তারাই কৃতকার্য ।[সুরা-নুর,
আয়াত-৫২]"আর তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের, যাতে
তোমাদের উপর রহমত করা হয় ।"[সুরা-আলে-ইমরান, আয়াত-১৩২]"
নামায কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে
তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হতে পার ।"[সুরা-নুর, আয়াত-৫৬]"নামায কায়েম
কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর
।"[সুরা-আহযাব, আয়াত-৩৩]"তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত
প্রদান কর এবং আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। আল্লাহ খবর রাখেন
তোমরা যা কর।"[সুরা-মুজাদিলাহ, আয়াত-১৩]"আর যারা আল্লাহ ও
রাসুলের আনুগত্য করে তারা থাকবে তাদের সাথে, যাদের উপর আল্লাহ
অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্ম্শীলদের মধ্য থেকে।
আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম ।"[সুরা-নিসা, আয়াত-৬৯]"এবং
যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, তাকে তিনি জান্নাতে
দাখিল করাবেন, যার তলদেশে নহরসমুহ প্রবাহিত। পক্ষান্তরে যে
ব্যক্তি পিছনে ফিরে যাবে তিনি তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিবেন
।"[সুরা-ফাতহ, আয়াত-১৭]"তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর
রাসূলের আনুগত্য করবে এবং সৎকর্ম করবে, আমি তাকে দুবার
প্রতিদান দেব এবং তার জন্য আমি সম্মান জনক রিযিক প্রস্তুতকরে
রেখেছি ।[সুরা-আহযাব, আয়াত-৩১]" তিনি তোমাদের আমল-আচরণ
সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন
করলো ।[সুরা-আহযাব, আয়াত-৭১]" হে আমাদের রব! আমরা সে
বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করছি, যা তুমি নাযিল করেছ, আমরা
রাসূলের অনুসরন করছি। অতএব, আমাদিগকে সাক্ষ্যদাতাদের
তালিকাভুক্ত করে নাও ।"[সুরা-আলে-ইমরান, আয়াত-৫৩]"তোমরা
আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের অনুগত্য কর আর সাবধান হও।
আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে জেনে রাখ, আমার রাসূলের
দায়িত্ব প্রকাশ্য প্রচার করা ।" [সুরা-মায়িদা, আয়াত-৯২]" যে
রাসুলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে মুখ
ফিরিয়ে নিল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে
প্রেরণ করিনি ।[সুরা-নিসা, আয়াত-৮০]"তোমরা আল্লাহর আনুগত্য
কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। কিন্ত্ত তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও,
তবে আমার রাসূলের তো একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে স্পষ্টভাবে বাণী
পৌঁছে দেয়া ।[সুরা-তাগাবুন, আয়াত-১২]"বলুন, আল্লাহ ও রাসূলের
আনুগত্য কর। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আল্লাহ
কাফেরদিগকে ভালবাসেন না ।[সুরা-আলে ইমরান, আয়াত-৩২]" বলুনঃ
আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি
তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে সে
দায়ী এবং তোমাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে তোমরা দায়ী।
তোমরা যদি তাঁর আনুগত্য কর, তবে সৎ পথ পাবে। রসূলের দায়িত্ব
তো কেবল সুস্পষ্টরূপে পৌছে দেয়া ।[সুরা-নুর, আয়াত-৫৪]"অতএব
তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শুন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর।
এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। যারা মনের কার্পন্য থেকে মুক্ত,
তারাই সফলকাম ।"[সুরা-তাগাবুন, আয়াত-১৬]"যদি তোমরা তোমাদের
মতই একজন মানুষের আনুগত্য কর, তবে তোমরা নিশ্চিতরূপেই
ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।"[সুরা-মুমিনুন, আয়াত-৩৪]"তারা কি আল্লাহর
দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন তালাশ করছে? আসমান ও যমীনে যা কিছু
রয়েছে স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, সমস্ত কিছুই তাঁরই আনুগত্য
করে এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাবে ।"[সুরা-আলে- ইমরান, আয়াত-৮৩]"
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা অনুসরণ কর, যা আল্লাহ নাযিল
করেছেন’, তারা বলে ‘বরং আমরা অনুসরণ করব আমাদের বাপ-
দাদাদেরকে যার উপর পেয়েছি। যদি তাদের বাপ-দাদারা কিছু না বুঝে
এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত না হয়, তাহলেও কি ?"[সুরা-বাকারা,
আয়াত-১৭০]"আর নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে ওহী করে, যেন
তারা তোমাদের সাথে বিবাদ করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর,
তোমরাও মুশরেক হয়ে যাবে।"[সুরা-আন আম, আয়াত-১২১]"তারা
বলেঃ আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং
আমরা আনুগত্য করেছি; অতঃপর তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং
তারা বিশ্বাসী নয়।"[সুরা-নুর, আয়াত-৪৭]"আপনি কাফেরদের আনুগত্য
করবেন না এবং তাদের সাথে এর (কুরআনের)সাহায্যে কঠোর সংগ্রাম
করুন ।"[সুরা- ফোরকান, আয়াত-৫২]"অতএব, আপনি
মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করবেন না।[সুরা-কলাম, আয়াত-৮]"আর
যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, আপনি তার আনুগত্য করবেন না
।"[সূরা-কলাম, আয়াত-১০]" অতএব, আপনি আপনার পালনকর্তার
আদেশের জন্যে ধৈর্য্য সহকারে অপেক্ষা করুন এবং ওদের মধ্যকার
কোন পাপিষ্ঠ কাফেরের আনুগত্য করবেন না।"[সূরা-ইহসান,
আয়াত-২৪]"আর আপনি কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না
এবং তাদের নির্যাতন উপেক্ষা করুন আর আল্লাহর উপর ভরসা করুন।
তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট ।"[সুরা-আহযাব,
আয়াত-৪৮]"যেদিন অগ্নিতে তাদের মুখমন্ডল ওলট পালট করা হবে;
সেদিন তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং
রাসূলের আনুগত্য করতাম।"[সুরা-আহযাব, আয়াত-৬৬]
কুরআন হাদীস ও চার ইমামদের দৃষ্টিতে মাযহাব
বর্তমানে সারাবিশ্বে মুসলমানের সংখ্যা একশ আশি কোটিরও বেশী।
পৃথিবীর প্রত্যেক তিনজন ব্যাক্তির মধ্যে একজন মুসলমান।
অমুসলিমদের কাছে আমরা অর্থাৎ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা মুসলমান
বলে পরিচিত হলেও মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে অনেক নামে পরিচিত।
যেমন, হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী প্রভৃতি। এই নাম গুলি
আল্লাহ বা মুহাম্মাদ (সা) এর দেওয়া নয় এমনকি যাঁদের নামে এই
মাযহাব তৈরি করা হয়েছে তারাও এই নাম গুলো দেয়নি। মুসলমানদের
মধ্যে প্রচলিত চারটি মাযহাব, দল বা ফিকাহ ইসলামের কোনো নিয়ম
বা বিধান মেনে তৈরি করা হয়নি। কারন ইসলাম ধর্মে কোনো দলবাজী
বা ফিরকাবন্দী নেই। মুসলমানদের বিভক্ত হওয়া থেকে এবং ধর্মে নানা
মতের সৃষ্টি করা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করা হয়েছে। এই
মাযহাবগুলো রসুল (যা) এবং সাহাবাদের (রা) সময় সৃষ্টি হয়নি।
এমনকি ঈমামগনের সময়ও হয়নি। চার ইমামের মৃত্যুর অনেক বছর পরে
তাঁদের নামে মাযহাব তৈরি হয়েছে। কোরআন হাদীস ও চার ইমামের
দৃষ্টিতে মাযহাব কি, কেন, মাযহাব কি মানতেই হবে, মাযহাব মানলে কি
গোনাহ হবে, সে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করব ইনশাল্লাহ্!মাযহাব
তৈরিতে আল্লাহর কঠোর নিষেধাজ্ঞামুসলমানেরা যাতে বিভিন্ন দলে
আলাদা বা বিভক্ত না হয়ে যায় সে জন্য আল্লাহ পাক আমাদের
কঠোরভাবে সাবধান করেছেন। যেমন আল্লাহ তা’আলা কুরআনের সূরা
আন-আমর এর ১৫৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন ‘যারা দ্বীন সন্বন্ধে নানা
মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন, দলে বিভক্ত হয়েছে হে নবী! তাদের
সাথে তোমার কোনও সম্পর্ক নেই; তাদের বিষয় আল্লাহর
ইখতিয়ারভুক্ত। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবগত
করবেন। একটু থামুন। উপরের আয়াতটা দয়া করে বারবার পড়ুন এবং
বোঝার চেষ্টা করুন, চিন্তা করুন। আল্লাহ তা’আলা সরাসরি বলেছেন
যারা দ্বীন বা ধর্মে অর্থাৎ ইসলামে নানা মতগের সৃষ্টি করেছে এবং
বিভক্ত হয়েছে, তাদের সাথে আমাদের নবী মহাম্মাদ (সা) এর কোনো
সম্পর্ক নেই। যার সাথে নবীজীর (সা) কোনো সম্পর্ক নেই সে কি
মুসলমান? সে কি কখনো জান্নাতের গন্ধও পাবে। আমরা মুসলমান
কোরআন হাদীস মাননে ওয়ালা এটাই আমাদের একমাত্র পরিচয়।
আল্লাহ বলেন এবং তোমাদের এই যে জাতি, এতো একই জাতি; এবং
আমিই তোমাদের প্রতিপালক, অতএব আমাকে ভয় করো। (সূরা
মুউমিনুন ২৩/৫২)। তাহলেই বুঝতেই পড়েছেন ফরয, ওয়াজীব ভেবে
আপনারা যা মেনে চলছেন আল্লাহ তা মানতে কত কঠোরভাবে নিষেধ
করেছেন তবে শুধু এইটুকুই নয় আল্লাহ আরও অনেক আয়াতে এ ব্যাপারে
মানুষকে সাবধানবানী শুনিয়েছেন। যেমন সূরা রূমের একটি আয়াত দেখুন
যেখানে আল্লাহ পাক বলছেন ‘….. তোমরা ঐ সকল মুশরিকদের
অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা নিজেদের দ্বীনকে শতধা বিচ্ছিন্ন করে বহু
দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দল নিজেদের কাছে যা আছে তা
নিয়ে খুশি’ – (সূরা রুম ৩০/৩১-৩২)। বর্তমানে আমাদের সমাজের
অবস্থাও ঐ মুশরিকদের মতো। ইসলামকে তারা (মাযহাবীরা) বিভিন্ন
দলে বিভক্ত করেছে এবং তাদের নিজেদের কাছে যা আছে তা নিয়েই
তারা খুশি। তাদের সামনে কোনো কথা উপস্থাপন করলে তারা বলেনা
যে কুরআন হাদীসে আছে কি না। তারা বলে আমাদের ইমাম কি বলেছে।
এরা কুরয়ান হাদীসের থেকেও ইমামের ফিকাহকে অধিক গুরুত্ব দেয়।
অথচ ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে কুরআন হাদীস। তা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
উপরের আযাতে আল্লাহ তা’আলা আমাদের উপদেশ দিয়েছেন তোমরা
মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না; তোমরা ইসলামে মাযহাবের সৃষ্টি
করো না। অথচ আমরা কুরআনের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে দ্বীনে
দলের সৃষ্টি করেছি এবং নিজেকে হানাফী, মালেকী বা শাফেরী বলতে
গর্ব অনুভব করছি। আল্লাহ বলেন ‘হে ইমানদারগন তোমরা আল্লাহ ও
তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রগামী হয়ো না, এবং আল্লাহকে ভয় করো;
আল্লাহ সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী (সূরা হুরুরতে/০১) আমার প্রিয়
মাযহাবী ভাইয়েরা! এরকম কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশ জানার পরও কি
আপনারা মাযহাবে বিশ্বাসী হবেন এবং নিজেকে মাযহাবী বলে পরিচয়
দেবেন। যারা জানে না তাদের কথা আলাদা। আল্লাহ বলেন ‘বলো, যারা
জানে এবং যারা জানেনা তারা কি সমান? (সূরা যুমার ৩৯/০৯)। তাই
আজই তওবা করে সঠিক আব্বীদায় ফিরে আসুন। আল্লাহ আমাদের
সকলকে ইসলাম বোঝার তোফিক দিন। আমীন!ইমামরা মাযহাব সৃষ্টি
করেননিভারতবর্ষের বিখ্যাত হাদীসশাস্ত্রবিদ ও হানাফীদের শিক্ষাগুরু
যাকে হানাফীরা ভারতবর্ষের ‘ইমাম বুখারী’ বলে থাকেন সেই শাহ
আলিউল্লাহ মুহাদ্দিসদেহেলভী (রহ) বলেছেন – ‘ই’লাম আন্না না-সা-
কা-নু ক্কারলাল মিআতির রা-বিআতি গাইরা মুজমিয়ীনা আলাত্-
তাকলীদিল খা-লিস লিমায় হাবিন্ ওয়া-হিদিন্ বি-আইনিহী’ অর্থাৎ
তোমরা জেনে রাখো যে, ৪০০ হিজরীর আগে লোকেরা কোন একটি
বিশেষ মাযহাবের উপর জমে ছিল না’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ; ১৫২
পৃষ্ঠা)। অর্থাৎ ৪০০ হিজরীর আগে নিজেকে হানাফী, শাফেরী বা
মালেকী বলে পরিচয় দিতো না। আর চারশো হিজরীর অনেক আগে
ইমামরা ইন্তেকাল করেন। ইমামদের জন্ম ও মৃত্যুর সময়কালটা একবার
জানা যাক তাহলে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে। · তাহলে মাযহাব কে
সৃষ্টি করল। ইমামের নাম জন্ম মৃত্যু আবু হানীফা (রহ) ৮০ হিজরী ১৫০
হিজরী ইমাম মালেক (রহ) ৯৩ হিজরী ১৭৯ হিজরী ইমাম শাকেরী (রহ)
১৫০ হিজরী ২০৪ হিজরী আহমদ বিন হাম্বাল (রহ) ১৬৪ হিজরী ২৪১
হিজরী বিশিষ্ট হানাফী বিদ্বান শাহ ওলিউল্লাহ দেহেলভী (রহ) এর
কথা যদি মেনে নেওয়া যায় যে ৪০০ হিজরীর আগে কোনো মাযহাব ছিল
না, এবং ৪০০ হিজরীর পরে মানুষেরা মাযহাব সৃষ্টি করেছে, তার মানে
এটা দাঁড়ায় যে আবু হানীফার ইন্তেকালের ২৫০ বছর পর হানাফী মাযহাব
সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম মালেকের ইন্তেকালের ২২১ বছর পর মালেকী
মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম শাফেরীর ইন্তেকালের ১৯৬ বছর পরে
শাফেরী মাযহাব এবং ইমাম আহমাদের ইন্তেকালের ১৫৯ বছর পর
হাম্বলী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ ইমামদের জীবিত অবস্থায়
মাযহাব সৃষ্টি হয়নি। তাঁদের মৃত্যুর অনেকদিন পরে মাযহাবের উদ্ভব
হয়েছে। আর একবার চিন্তা করে দেখুন মাযহাব বা দল সৃষ্টি করাতে
কোরআন ও হাদিসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মহামান্য
ইমামরা ছিলেন কোরআন হাদীসের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসারী এবং
ধর্মপ্রান মুসলিম। তাঁরা কি কোরআন হাদীসকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে
মাযহাব তৈরি করবেন যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, এটা কখনো হতে পারে?
যারা বলে ইমামরা মাযহাব সৃষ্টি করেছেন তারা হয় মুর্খ নয় বেইমান।
তারা ইমামদের প্রতি অপবাদ দেয়।মাযহাব সৃষ্টি হল কিভাবেফারসীতে
একটি প্রবাদ আছে ‘মান তোরা হাজী গো ইয়াম তু মোরা হাজী
বোগো’ অর্থাৎ একজন লোক আর একজনকে বলছে, ভাই! যদিও তুমি
হাজী নও তথাপি আমি তোমাকে হাজী সাহেব বলছি এবং যদিও আমি
হাজী নই তুমি আমাকে হাজী সাহেব বলো। এভাবে একে অপরকেহাজী
সাহেব বলে ডাকার ফলে আমরা দু-জনেই হাজী সাহেব হয়ে যাবো।
এভাবেই আবু হানীফার অনুসারীদের অথবা তাঁর ফতোয়া মান্যে
ওয়ালাদের অন্যেরা হানাফী একইভাবে ইমাম মালেকের ফতোয়া মাননে
ওয়ালাদের মালেকী বলে ডাকাডাকির ফলে মাযহাবের সৃষ্টি হয়েছে। আজ
যা বিরাট আকার ধারন করেছে। আবু হানীফা (রহ) বা তাঁর শিষ্যরা
কখনো বলেননি আমাদের ফতোয়া যারা মানবা তারা নিজেদের পরিচয়
হানাফী বলে দিবা। অথবা ইমাম মালেক বা শাফেয়ীও বলে যাননি যে
আমার অনুসারীরা নিজেকে মালেকী বা শাফেয়ী বলে পরিচয় দিবা।
ইমামরা তো বটেই এমনকি ইমামদের শাগরেদরা কিংবা তাঁর
শাগরেদদের শাগরেদরাও মাযহাব সৃষ্টি করতে বলেননি। যখন আমাদের
মহামতি ইমামরা মাযহাব সৃষ্টি করেননি এবং করতেও বলেননি তখন
উনাদের নামে মাযহাব সৃষ্টি করার অধিকার কেন দিল?হাদীস বিরোধী
বক্তব্যের ব্যাপারে ইমামদের রায়মাযহাবীদের মধ্যে কিছু লোক দেখা
যায় যারা ইমামদের তাক্কলীদ করে অর্থাৎ অন্ধ অনুসরন করে। তারা
ইমামদের বক্তব্যকে আসমানী ওহীর মতো মানে। কোরআন-হাদিস
বিরোধী কোনো রায় হলেও তাতে আমল করে। তাই সেই সব লোকদের
জন্য হাদীস অনুসরনের ব্যাপারে ইমামদের মতামত এবং তাদের হাদীস
বিরোধী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে তাদের কয়েকটি উক্তি
দেওয়া হল। ইনশাল্লাহ্! মাযহাবী ভাইয়েরা এ থেকে অনেক উপকারিত
হবেন।আবু হানীফা (রহ)১) যখন হাদীস সহীহ হবে, তখন সেটাই আমার
মাযহাব অর্থাৎ হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব। (ইবনুল
আবেদীন ১/৬৩; রাসমুল মুফতী ১/৪; ঈক্কামুল মুফতী ৬২ পৃষ্ঠা) ২)
কারো জন্য আমাদের কথা মেনে নেওয়া বৈধ নয়; যতক্ষন না সে
জেনেছে যে, আমরা তা কোথা থেকে গ্রহন করেছি। (হাশিয়া ইবনুল
আবেদীন ২/২৯৩ রাসমুল মুফতী ২৯, ৩২ পৃষ্ঠা, শা’ রানীর মীথান
১/৫৫; ইলামুল মুওয়াক্কিঈন ২/৩০৯) ৩) যে ব্যাক্তি আমার দলিল
জানে না, তার জন্য আমার উক্তি দ্বারা ফতোয়া দেওয়া হারাম। (আন-
নাফিউল কাবীর ১৩৫ পৃষ্ঠা) ৪) আমরা তো মানুষ। আজ এক কথা বলি,
আবার কাল তা প্রত্যাহার করে নিই। – (ঐ) ৫) যদি আমি এমন কথা
বলি যা আল্লাহর কিবাব ও রাসুলের (সা) হাদীসের পরিপন্থি, তাহলে
আমার কথাকে বর্জন করো। (দেওয়ালে ছুড়ে মারো)। (ঈক্কাবুল হিমাম
৫০ পৃষ্ঠা)ইমাম মালেক (রহ)১) আমি তো একজন মানুষ মাত্র। আমার
কথা ভুল হতে পারে আবার ঠিকও হতে পারে। সুতরাং তোমরা আমার
মতকে বিবেচনা করে দেখ। অতঃপর যেটা কিতাব ও সুন্নাহর অনুকুল পাও
তা গ্রহন কর। আর যা কিতাব ও সুন্নাহর প্রতিকুল তা বর্জন করো।
(জানেউ বায়ানিল ইলম ২/৩২, উসুলুল আহকাম ৬/১৪৯) ২) রাসুলুল্লাহ
(সা) এর পর এমন কোনো ব্যাক্তি নেই যার কথা ও কাজ সমালোচনার
উর্ধে। একমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা) ই সমালোচনার উর্ধে। (ইবনু
আবদিল হাদী, ১ম খন্ড, ২২৭ পৃষ্ঠা, আল ফতোয়া – আসসাবকী, ১ম
খন্ড ১৪৮ পৃষ্ঠা, উসুলুল আহকাম ইবনু হাযম, ষষ্ঠ খন্ড ১৪৫ – ১৭৯
পৃষ্ঠা)। ৩) ইবনু ওহাব বলেছেন, আমি ইমাম মালেককের উয়ব মধ্যে দুই
পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার বিষএ এক প্রশ্ন করতে শুনেছি। তিনি
বলেন লোকদের জন্য এটার প্রয়োজন নীই। ইবনু ওহাব বলেন, আমি
মানুষ কমে গেলে তাঁকে নিরিবিলে পেয়ে বলি ‘তাতো আমাদের জন্য
সুন্নাহ। ইমাম মালেক বলেন, সেটা কি? আমি বললাম, আমরা লাইস বিন
সাদ, ইবনু লোহাইআ, আমর বিন হারেস, ইয়াবিদ বিন আমার আল-মা
আফেরী, আবু আবদুর রহমান আল হাবালী এবং আল মোস্তাওরাদ বিন
শাদ্দাদ আল কোরাশী এই সুত্র পরম্পরা থেকে জানতে পেরেছি যে,
শাদ্দাদ আল কোরাশী বলেন, আমি রাসুল (সা) কে কনিষ্ঠ আঙ্গুল
দিয়ে দুই পায়ের আঙ্গুল খেলাল করতে দেখেছি। ইমাম মালেক বলেন,
এটা তো সুন্দর হাদীস। আমি এখন ছাড়া আর কখনো এই হাদীসটি
শুনিনি। তারপর যখনই তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, তখনই তাঁকে
পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার আদেশ দিতে আমি শুনেছি। (মোকাদ্দামা
আল জারাহ ওয়াত তা দীল- ইবনু হাতেমঃ ৩১- ৩২ পৃষ্ঠা)ইমাম শাফেরী
(রহ)১) হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব। (মাজমু ১/৬৩;
শা’রানী ১/৫৭) ২) আমি যে কথাই বলি না কেন অথবা যে নীতিই
প্রনয়ন করি না কেন, তা যদি আল্লাহর রাসুল (সা) এর নিকট থেকে
বর্ণিত (হাদীসের) খিলাপ হয়, তাহলে সে কথাই মান্য, যা রাসুল (সা)
বলেছেন। আর সেটাই আমার কথা। (তারীখু দিমাশ্ক; ইলামুল
মুওয়াক্কিঈন ২/৩৬৬,৩৬৪) ৩) নিজ ছাত্র ইমাম আহমাদকে সম্বোধন
করে বলেন) হাদীস ও রিজাল সম্বন্ধে তোমরা আমার চেয়ে বেশি
জানো। অতএব হাদীস সহীহ হলে আমাকে জানাও, সে যাই হোক না
কেন; কুকী, বাসরী অথবা শামী। তা সহীহ হলে সেটাই আমি আমার
মাযহাব (পন্থা) বানিয়া নেবো। (ইবনু আবী হাতীম ৯৪-৯৫ পৃষ্ঠা;
হিলয়াহ ৯/১০৬) ৪) আমার পুস্তকে যদি আল্লাহর রাসুল (সা) এর
সুন্নাহের খেলাপ কে কথা পাও, তাহলে আল্লাহর রাসুল (সা) এর
কথাকেই মেনে নিও এবং আমি যা বলেছি তা বর্জন করো। (নাওয়াবীর
মা’জমু ১/৬৩; ইলামূল মুওয়াক্কিঈন ২/৩৬১) ৫) যে কথাই আমি বলি
না কেন, তা যদি সহীহ সুন্নাহর পরিপন্থি হয়, তাহলে নবী (সা) এর
হাদীসই অধিক মান্য। সুতরাং তোমরা আমার অন্ধানুকরন করো না।
(হাদীস ও সুন্নাহর মুল্যমান ৫৪ পৃষ্ঠা) ৬) নবী (সা) থেকে যে হাদীসই
বর্ণিত হয়, সেটাই আমার কথা; যদিও তা আমার নিকট থেকে না শুনে
থাকো। (ইবনু আবী হাতীম ৯৩-৯৪)ইমাম আহমাদ (রহ)১) তোমরা
আমার অন্ধানুকরন করো না, মালেকেরও অন্ধানুকরন করো না।
অন্ধানুকরন করো না শাফেরীর আর না আওয়ারী ও ষত্তরীব বরং
তোমরা সেখান থেকে তোমরা গ্রহন কর যেখান থেকে তারা গ্রহন
করেছেন। (ইলামুল মোয়াক্কিঈন ২/৩০২) ২) যে ব্যক্তি আল্লাহর
রাসুল (সা) এর হাদীস প্রত্যাখ্যান করে, সে ব্যক্তি ধ্বংসোন্মুখ।
(ইবনুল জাওযী ১৮২ পৃষ্ঠা) ৩) আওযাঈ; ইমাম মালেক ও ইমাম আবু
হানীফার রায় তাদের নিজস্ব রায় বা ইজতিহাদ। আমার কাছে এসবই
সমান। তবে দলিল হল আসার অর্থাৎ সাহাবী ও তাবেঈগনের কথা। (ইবনু
আবদিল বার-আল-জামে, ২ খন্ড, ১৪৯ পৃষ্ঠা) ইমামদের এই সকল
বক্তব্য জানার পর আমরা বলতে পারি প্রকৃতই যারা ইমামদের
ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন, মান্য করেন তারা ইমামদের কথা অনুযায়ী
চলবেন এবং সহীহ হাদীসকেই নিজের মাযহাব বানাবেন। তাক্কলীদ
করবেন না। সরাসরী সেখান থেকে গ্রহন করবেন যেখান থেকে ইমামরা
করেছেন অর্থাৎ সরাসরী হাদীস কোরয়ান থেকে। ইমামরা কোনো
বিষয়ে ভুল ফতোয়া (সহীহ হাদীস তাঁদের কাছে না পৌছানোর কারনে)
দিয়ে থাকলে তা প্রত্যাখ্যান করা এবং সহীহ হাদীসের উপর আমল
করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলাম বোঝার ও গ্রহীহ হাদীসের
উপর আমল করার তৌফিক দিন। আমীন!
Price : *Happy Shopping

আজকের আইডিয়ার নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url